Mofakkarul Islam Arrest Bagdogra Airport: মালদা অশান্তির মূল অভিযুক্ত মোফাক্কেরুল ইসলাম বেঙ্গালুরু পালানোর ছক কষলেও শেষমেশ বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে সিআইডির জালে ধরা পড়েন, ঘটনায় নতুন মোড়
মালদার কালিয়াচক, মোথাবাড়ি কাণ্ড যেন নতুন মোড় নিল নাটকীয় ঘটনায়। বিচারপতিদের হেনস্থার অভিযোগ, ভাইরাল হওয়া এক মহিলা বিচারপতির আর্তনাদ, আর তার জেরে প্রশাসনিক স্তরে সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে গোটা ঘটনা এখন রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে এল মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত এক আইনজীবীর নাম—মোফাক্কারুল ইসলাম। অভিযোগ, তাঁর উস্কানিমূলক বক্তব্য থেকেই ছড়ায় উত্তেজনা। আর সেই ঘটনার জেরেই তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি—বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে সিআইডি।
এই ঘটনায় শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থার মর্যাদা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও। পাঠক হিসেবে আপনি এই প্রতিবেদনে জানতে পারবেন—ঠিক কী ঘটেছিল মালদায়, কেন বিচারপতিরা হেনস্থার শিকার হলেন, এবং কীভাবে এক আইনজীবীর বক্তব্য পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক করে তুলল।
ঘটনার সূত্রপাত এআইআর (Electoral Roll Revision) বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে। অভিযোগ, মথাবাড়ি ও সুজাপুর এলাকায় বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে একটি ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়, যেখানে বিচারপতিদের নিয়োগ করা হয় অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য।
এই বিচারপতিরা মালদায় গিয়ে কাজ শুরু করতেই স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। বহু মানুষের দাবি ছিল—যাদের নাম কাটা গেছে, তা দ্রুত পুনরায় তালিকাভুক্ত করতে হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে কালিয়াচক ২ নম্বর ব্লক এলাকায়।
ধীরে ধীরে এই ক্ষোভ বিক্ষোভে রূপ নেয়। বিচারপতিরা যখন নিজেদের কাজ করতে যান, তখন তাঁদের ঘিরে ধরে উত্তেজিত জনতা। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে বিচারপতিরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে আসে এক ভয়াবহ ভিডিও। সেখানে এক মহিলা বিচারপতি কাঁদতে কাঁদতে সরাসরি হাইকোর্টের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন—যদি তাঁর কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে যেন তাঁর সন্তানের দায়িত্ব আদালত নেয়। এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বিচারব্যবস্থার প্রতিনিধিরা যদি নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়—এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেয় দেশের শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং রাজ্যের নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা জোরদার করার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা দ্রুত পুনরুদ্ধারের নির্দেশও দেওয়া হয়। এই ঘটনার তদন্তে উঠে আসে মোফাক্কেরুল ইসলামের নাম। পেশায় তিনি একজন আইনজীবী এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে জনতাকে উত্তেজিত করেছিলেন।
একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি নির্বাচন কমিশনের কাজ এবং বিচারপতিদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করছেন। এমনকি তিনি এই প্রক্রিয়াকে “ঘোড়ার ডিম” বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উস্কে দেওয়া হচ্ছিল। অভিযোগ, তিনি মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে প্রশাসন কিছুই জানে না এবং এইভাবে বসে থাকলে চলবে না। এই ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত তা হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
এছাড়াও ভিডিওতে ধর্মীয় উস্কানিমূলক ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই মোফাক্কেরুল ইসলাম আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। জানা যায়, তিনি বেঙ্গালুরু পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছন।
কিন্তু গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়ে আগে থেকেই সতর্ক ছিল সিআইডি। বিমানবন্দর থেকেই তাঁকে আটক করা হয়। পরে উত্তরবঙ্গের এডিজি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর গ্রেফতারের কথা জানান। এই গ্রেফতারির পর প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় ঘটনার মূল অভিযুক্তকে ধরতে এত দেরি হল কেন? প্রশাসনের তরফেও স্বীকার করা হয়েছে যে তদন্তে কিছুটা সময় লেগেছে।
এই ঘটনায় মোফাক্কেরুল ইসলাম এর এক সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধেও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। মোফাক্কেরুল ইসলাম মূলত উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের বাসিন্দা। তবে কালিয়াচক থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তিনটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে—একজন বিতর্কিত অতীতের ব্যক্তি কীভাবে এত বড় একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারলেন? প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্য ও বক্তব্যই এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মালদা কাণ্ডে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনে ইতিমধ্যেই এনআইএ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
